Logo
Logo
×

মতামত

গণতন্ত্র ভাঙার নয়, গণতন্ত্রকে জবাবদিহিমূলক করার সময়

মুক্তাদির রশীদ

মুক্তাদির রশীদ

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:১৩

গণতন্ত্র ভাঙার নয়, গণতন্ত্রকে জবাবদিহিমূলক করার সময়

এআই

বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক করার সহজ উপায় হলো সুবিধাবাদী, অতিআবেগী এলিট অ্যারিস্টোক্র্যাটদের শেখ হাসিনার ভাষায় চাপে রাখা। এই শ্রেণির মানুষদের অনেকেই নব্য সুশীল সুবিধাবাদী সালমান মুক্তাদির কিংবা ‘মাদার অব সাবঅলটার্ন’-দের মাথায় তুলে রাখে মূলত একটি ‘সুশীল সরকারের’ ন্যায্যতা তৈরি করার জন্য।

এসব সালমানরাই তো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় ‘কিসের নির্বাচন’ বলে অগণতান্ত্রিক সরকারের পাঁচ বছরের ন্যায্যতার চেষ্টা করেছে।

সেই ধারাবাহিকতায় প্রায়ই শোনা যায়, অর্বাচীনরা এদেশীয় গণতান্ত্রিক কাঠামোয় গড়ে ওঠা সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশকে উদ্ধার করবে। মানে, দেশীয় নয়, বিদেশি প্রভুদের সরকার কায়েম করার কথা—নয়া ইউক্রেন বানানোর প্রচেষ্টা।

তারা মনে করে, জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের চেয়ে নিয়ন্ত্রিত, অভিজাতনির্ভর একটি ব্যবস্থা হয়তো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বেশি কার্যকর। ধানমন্ডি, গুলশানের এলিটরা সে কারণে হঠাৎ করে ‘মাদার অব সাবঅলটার্ন’ সাজে।

কিন্তু এখানেই মূল বিপদ। সুশীল সরকার মানেই শেষ পর্যন্ত একটি কট্টরপন্থী দল বা গোষ্ঠীকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করা। পাকিস্তানি এমন কাজটি জিয়াউল হক করেছিলেন। তাতে তাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া আরও হোচট খেয়েছে।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, আর সেই শূন্যতা শেষ পর্যন্ত সংগঠিত ও শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলোই দখল করে।

আমরা দেখেছি, গত ১৭ মাসে, এমনকি অতীতে ১/১১-এর সেনা সমর্থিত সরকারের সময়ও এসব এলিটরা কীভাবে দুর্নীতির বয়ান তুলে বিরাজনীতিকরণকে প্রশ্রয় দিয়েছে।

তাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত কোনো ‘সুশীল সরকার’ প্রতিষ্ঠা নয়; বরং বিদ্যমান গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে ধীরে ধীরে আরও জনোপযোগী, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহিমূলক করে তোলা।

‘ক্যাপ্টেন বাংলাদেশরা’ বিদেশফেরত নব্য এলিটদের তল্পিবাহক হতে পারেন। কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে, আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের মতো বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ক্রীড়নকরাও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন।

জামায়াত ছেড়ে এবি পার্টি, আর তারপর সেখান থেকেও মুক্তি নিয়েছেন।

রাজনীতি কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কিংবা কোনো বিশেষ শ্রেণির সামাজিক মর্যাদা রক্ষার প্রকল্প নয়। রাজনীতির কেন্দ্রে থাকতে হবে জনগণ, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহি।

আমাদের বর্তমান সংকটকে শুধু সরকার দিয়ে ব্যাখ্যা করলেও ভুল হবে। এ সরকার অনেক কিছুতেই ব্যর্থ হচ্ছে বা হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ব্যর্থ হতে পারে, নীতি ভুল হতে পারে, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হতে পারে। কিন্তু সরকারের ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়ায় যদি আমরা গণতন্ত্রের ওপরই আস্থা হারিয়ে ফেলি, তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না; বরং সংকট আরও গভীর হবে।

তখন অনেকে আবেগী হয়ে বলবে, ‘এ দেশ আমার না।’ এই মনোভাবই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ রাষ্ট্র ও সমাজের সংকটের সময়ে নাগরিকরা যদি নিজেদের দেশ থেকে মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, তাহলে সামাজিক বন্ধন আরও দুর্বল হয়। ভাইরা হয়তো আইয়ুব খান-দেওয়া জায়গায় বসে ফুটানি করে, নয়তো অবৈধ সম্পদের ওপর ভিত্তি করে নব্যসুশীল সেজেছে। আমার এসব এমনই মনে হয়। কিন্তু ব্যক্তিগত ক্ষোভ দিয়ে রাষ্ট্রের সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

সমাজ যখন ভেঙে পড়ে, তখন রাজনৈতিক সংকটও তীব্রতর হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দুর্বল হয়, পারস্পরিক আস্থা কমে যায়, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থাও কমতে থাকে। তাই পরিবর্তনের প্রথম কাজ শুধু সরকার পরিবর্তন নয়—সমাজের ভেতরেও আস্থা ও সম্পর্ক পুনর্গঠন করা।

আবার সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলুন। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ বাড়ান। পরিবার, পাড়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও নাগরিক সমাজে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনুন। দেখবেন, সমাজ নিজেই ধীরে ধীরে তার রূপ পাল্টাবে—নতুন উদ্যমে, নতুন সম্পর্কের ভিত্তিতে।

এসব আতেলীয় কথাবার্তা কানে নেবেন না। মনে রাখবেন, এরা আইয়ুব খানের সুবিধা পেয়ে ঢাকার এলিট হয়েছে। তারা মনে মনে স্বৈরশাসনকে নিজেদের জন্য সুবিধাজনক মনে করে দুর্বল গণতান্ত্রিক পরিকাঠামোকে বিদেশি মদদে আরও দুর্বল করে একটি ব্যর্থ ব্যবস্থাপনাকে আমন্ত্রণ জানায়। ব্যর্থ আফ্রিকান রাষ্ট্রগুলোতে যেমন জাতিসংঘ কাজ করেছে। আর আরব বিশ্বে হুতিরা হয়েছে শক্তিশালী। 

তাই আমাদের কাজ হবে যেকোনো মূল্যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা। সময় লাগবে। অনেকটা সন্তান মানুষ করার মতোই ব্যাপার। 

 সরকার পরিবর্তন গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি হলো—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মধ্যে রাখা, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো। এটা কাগজে কলমে, চুক্তি বা লিখে দস্তখত দিয়ে হয় না। 

সমস্যা চিহ্নিত করুন। সমস্যার বাস্তবসম্মত গণতান্ত্রিক সমাধান খুঁজে বের করুন। রাজনীতিবিদদেরকেই করতে হবে। ভাড়াটে সুশীলদের দিয়ে কাজ হবে না।  

প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল না করে প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করুন। প্রতিশোধের রাজনীতির পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন। ব্যক্তি বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর না করে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলুন, যেখানে ক্ষমতাসীন যে-ই হোক, তাকে জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হয়।

মনে রাখবেন, সুশীলরা তথা কথিত ছোটং গ্যাংরা চায় আপনাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে তাদের পশ্চিমা জীবনকে আরও আয়েশী ও শক্তিশালী রাখতে। এদের সেকেন্ড হোম বাংলাদেশ।

তারা হয়তো বোঝাতে চাইবে যে সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র বোঝে না, জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য নয় কিংবা দেশের জন্য একজন শক্তিশালী অভিভাবক দরকার। এই ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করুন। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই যে জনগণ ভুল করতে পারে, কিন্তু সেই ভুল সংশোধনের পথও গণতন্ত্রের মধ্যেই থাকে।

যেহেতু আমরা এ ভূমির সন্তান এবং বাংলাদেশের বাইরে আমাদের কোথাও কোনো ঠিকানা নেই, তাই কথিত পশ্চিমা ঢংয়ের বিপ্লবী চিন্তা বাদ দিয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে জবাবদিহিমূলক করুন।

দেশকে নতুন করে গড়ার দায়িত্ব অন্য কারও নয়—আমাদেরই। এই দেশের সমস্যা আছে, সংকট আছে, ব্যর্থতা আছে। কিন্তু এই দেশ আমাদের। তাই দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা না বলে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে, সমাজের ভেতরেই নতুন সম্পর্ক, নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে।

আর যদি মনে করেন ষড়যন্ত্র করে বেঁচে যাবেন, তা করতে পারেন। মনে রাখবেন, ১/১১-এর ঘা কিন্তু এখনো শুকায়নি। ইতিহাসের শিক্ষা হলো—কোনো ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কোনো ব্যবস্থা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয় এবং জনগণকে দীর্ঘদিন পাশ কাটিয়ে কোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত টিকিয়ে রাখা যায় না।

Logo

অনুসরণ করুন