হাসিনার শাসন, তারেক রহমানের কৌশল ও বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতি
সংগৃহীত
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকার কীভাবে পরিচালনা করেছেন, তার ওপর ভালো গবেষণার দরকার ছিল। যেগুলো হয়েছে, অধিকাংশই বিদেশি অর্থায়নে হওয়ায় সেগুলোতে পশ্চিমাদের দ্বারা প্রভাবিত (Western bias) আছে বলে মনে করি।
তার শাসনামলের সবচেয়ে বড় সক্ষমতা ছিল পেশাদারদের তার অনুগত করতে পারা। অবশ্য ২০১৮ সালের ‘লাইলাতুল নির্বাচন’-এর পর তা ফিকে হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে তা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পশ্চিমারা ২০২৪ সালের ‘আমি-ডামি’ নির্বাচনে তারেক রহমানকে আনতে প্রচুর চেষ্টা চালায়। এমনকি বাংলাদেশে থাকা বিএনপির একটি গ্রুপ সে নির্বাচনে যাওয়ার আগ্রহী হয়েছিল, কিন্তু শেষমেশ ব্যর্থ হয়।
শেখ হাসিনার শাসনামলে দুষ্টু আমলা, পুলিশ, বিচারক, এবং সাংবাদিক কিংবা অন্য পেশার মানুষরা যেমন ক্ষমতায়িত হয়েছে, তেমনি তিনি আবার গুরুত্বপূর্ণ অনেক জায়গায় পেশাদারদের বেছে নিয়েছেন। এটাই ছিল তার সাফল্যের বড় চাবিকাঠি।
এমনকি ছাত্রশিবির নেতাকেও জেলার এসপি বানিয়েছেন। ফলে অনেক শিক্ষিত পেশাদার কর্মকর্তাও তাকে সমর্থন দিয়েছেন। আর আমাদের বেশিরভাগ সুবিধাবাদী সুশীলরা ও প্রগতিশীলরা তো তার পোষ্য ছিল। সাংবাদিকদের যা দিয়েছেন, তাতে তো গলা উপচে বের হবে। অনেকে পরে ‘বিপ্লবী’ হয়েছেন ক্ষমতা ভাগ-বাটোয়ারার প্রশ্নে।
তাই ইউনূস সরকারের সময় জামায়াত ঠিক সব জায়গায় শেখ হাসিনাকেই তাদের রোল মডেল বানিয়েছে। সব দখল করতে তারা সামনে বিএনপি আর এনসিপির মাথামোটাদের ব্যবহার করেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের বিশাল সাফল্য এসেছে।
বিএনপির যেহেতু নিজস্ব লোক কম—বেশির ভাগই ভাড়াটে, সুবিধাকামী এবং শিবির থেকে আউটসোর্সিং করা—তাই সে কিছুটা বিপদে আছে । আবার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের একটি জাতীয়তাবাদী প্রজন্ম ভয়ানকভাবে ‘বোঝা’ হয়ে উঠেছে। জেল, জুলুম আর নির্যাতনে তারা বিধ্বস্ত হয়েছে।
আওয়ামী লীগ তার প্রথম পাঁচ বছরে এই বোঝাকে আর্থিকভাবে এতটাই শক্তিশালী করেছে যে অন্যের বাসায় রাত কাটানো মানুষগুলো দুবাই বা মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়তে পেরেছে। আরও ১৫ বছর এভাবে চলতে পারবে।
পার্থক্য হলো, আওয়ামী লীগ জামায়াত-শিবিরের যাকে ক্ষমতায়িত করেছে, তাকে জামায়াত-শিবির জেনেই করেছে। বিএনপি সেটা বিএনপি মনে করে করছে, তাই সংকটটা প্রকট হচ্ছে। একারণেই টুকু সাহেব হাসপাতালে। বা আপাতত সিন-আউট।
তবে বিএনপির সুবিধাটা হলো, এর ক্যাজুয়ালটি কম। তার মানে, তারেক রহমান ক্ষমতা হাতেগোনা কয়েকজনের কাছে রেখেছেন, যাতে তা ভবিষ্যতে ‘widespread’ আর ‘systematic’ হয়ে উঠতে না পারে।
যেহেতু পাওয়ার সেন্টারের পেনিট্রেশন কী কী, তা অনেকে বুঝতে পারছেন না, তাই তিনি কোন ফুলে পূজা নেবেন, অনেকে ধরতে না পেরে বলছেন, এ সরকার দুর্বল। ভদ্রলোক জানেন, বিপদে আসলে খুব কম মানুষকে পাওয়া যায়। তাই টিম যত ছোট, তত শক্ত। নিকোলাস মাদুরো হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে।
তাই দেখবেন, তিনি এত মানুষ থাকতে সালাউদ্দিন আহমেদ (ভাই)-কে না চাইতেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী করেছেন। আর কাউকেই এ কাজে ভরসা করতে পারেন না। আর তাই ছোটন গং, এনসিপির গুপ্ত অংশ বা পিনাকীর টার্গেট সালাউদ্দিন আহমেদ। তাদের মনে তো ভেনেজুয়েলা একটি সুন্দর স্মৃতি।
সমস্যাটা শেখ হাসিনা জানতেন, কিন্তু ঠিক তার উল্টোটা করেছিলেন। তাতেও তো ৫ তারিখ ঠেকাতে পারেননি। মাঠের সংঘাত দেখে, ৪ তারিখে তাই আমি যখন সাংবাদিক কামরান ভাইকে বললাম, ‘আপনার আপা কালকেই পালাবে। হেলিকপ্টারে পালাবে’, তখন আমাকে উপহাস করেন।
তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকার কিছু ব্যক্তিকে সুযোগ করে দিচ্ছে। ধরুন, আপনাকে বিএনপির লোক বলে লোকে গালি দেবে, কিন্তু বিএনপি আপনাকে আপন করবে না। এ মডেলটা নতুন নয়, তবে কার্যকর। এটা হলো organic nationalist force তৈরি করার চেষ্টা। আপনাকে বাহবা দেবে, কিন্তু কাছে ভিড়তে দেবে না। এটা খুব কাজে দেবে।
আর বিএনপি জানে, ঢাকা-কেন্দ্রিক, বিদেশে এক পা রাখা, এলিট সুবিধাবাদী সুশীলদের পুকুর ভরে দিলেও সুযোগ পেলেই ফোঁস করে উঠবে। তাই হুমায়ুন কবীর ‘জ্বালা জ্বালা’ গান মনে করিয়ে দেন—অনেকটা undiplomatic ওয়েতে। Defence-এ খেলা মানুষ striker হলে এমনটি হয়।
৬/৭ মাস একটি সরকারের জন্য বোঝা দুরূহ। তিনি যখন লন্ডনে, তখন তার সঙ্গে যারা দেখা করেছেন, তাদের প্রায় সকলের কাছে প্রশ্ন ছিল—আগামীর সরকারে আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
অনেককে সুযোগ করে দিয়েছেন। নির্বাচনের প্রায় ছয় মাস আগে কে কে থাকছেন, তা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবার তার নির্বাচনী টিমে কাজ করা অনেকে নির্বাচনের পর কোনো পদ-পদবি না পেয়ে বিদেশে ফিরে গেছেন। শুনে তিনি নতুন দায়িত্ব পেয়েছেন। অনেকে এখনও হতাশ। তারা priority নয়। অথবা তারা রিজার্ভ প্লেয়ার।
এ সরকারকে ‘রেইনবো সরকার’ বলতে পারেন। অনেক সমস্যা আছে, তবে সরকারে যাওয়ার প্রত্যাশা থাকায় অনেকে চুপ থাকছে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন।
যেমন ধরুন, কথিত জামায়াত-এনসিপি সরকার গঠন করতে পারে দেখে কথিত Voice of Reform বা North South University-কেন্দ্রিক যেসব হিজবুতি-জামায়াত জোট বিএনপিকে নির্বাচনের আগে অসহায় করে ফেলেছিল। বিদেশিদের একটু মহব্বত পাওয়ার আশায় তাদেরকে তো বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা যতই মিষ্টি কথা বলুক, মন থেকে মেনে নেবে না।
সোজা কথায়, আপনি যতই নতুন নতুন থিংক ট্যাঙ্ক করেন, আপনাদের উদ্বেগ তো কেউ শুনবে না। তাছাড়া ১/১১-এর পর, জুলাই-পরবর্তী সময়ে আমাদের কথিত সুশীলদের মুখোশ খুলে গেছে। তারা যে মুখে শেখ হাসিনাকে গালি দিলেও মনে মনে তার কার্যপদ্ধতি গ্রহণ করে বা পাঁচ বছর থাকার স্বপ্ন দেখেছে—এতেই আমরা হেরে যেতে শুরু করেছি।
শত হাইব্রিড, লন্ডনফেরতদের ভিড়ে বিএনপির অনেকে ১৮/১৯ বছর পরেও কিছু করতে পারছেন না দেখে হতাশ। তবে আরও হতাশ হচ্ছে কোনো রাজনৈতিক উদ্ভাবন না দেখতে পেয়ে।
তারেক রহমান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে বড় হয়েছেন। তিনি কাকে কোথায় রাখবেন, সেটা তিনি জানেন। তা না হলে খলিলুর রহমানকে কেন পররাষ্ট্র দেবেন? যেসব ভুল করছেন, সেগুলো শুধরাতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করবে তিনি শেখ হাসিনা থেকে কতটুকু read করতে পারবেন।

