৫ আগস্টের পর হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগ কেন ব্যর্থ হলো?
আপনাদের কখনো মনে হয়নি, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগ করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি কেন ব্যর্থ হলো?
ব্যর্থ হবে—এটা আমি নিশ্চিতই ছিলাম। কিন্তু কেন ব্যর্থ হবে, সেটি বোঝার চেষ্টা করেছি। এ কারণে দেশি-বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলেছি। তখন যেহেতু তাদের সঙ্গে প্রায় কেউই কথা বলত না, তাই আমি তাদের অবস্থান ও মানসিকতাটা বুঝতে চেয়েছি।
যারা তখন খুব জোর দিয়ে বলতেন, আওয়ামী লীগ নাই হয়ে যাবে, আমি তাদের বলতাম—এটা সম্ভব নয়।
এর অনেক কারণ ছিল। তার মধ্যে কয়েকটি কারণ আমার কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
১. রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি
১/১১-এর সময়ের কথা যদি মনে করেন, কিংবা যারা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের রাজনীতি দেখেছেন, তারা জানেন—আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর যারা শেখ হাসিনার জন্য কাজ করেছিলেন, তাদের অনেকেই কোনো না কোনোভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন।
এই পুরস্কৃত হওয়ার সম্ভাবনাটিই রাজনীতিকে শক্তিশালী করে।
ধরুন, কেউ ইসলামী ছাত্র শিবির করে। কেন করে? এর একটি সরাসরি উত্তর হলো—প্রাপ্তি। আপনি দল করবেন, দল আপনাকে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে দেবে।
আপনার কোনো ক্ষতি হলে দল আপনার পাশে দাঁড়াবে, প্রয়োজনে প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করবে। এ ধরনের নিশ্চয়তা আর কেউ খুব সহজে দিতে পারে না। বিএনপিও খুব সীমিত পরিসরে এ ধরনের কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা করে।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত এই দুটি দলের বাইরে বৃহৎ রেজিমেন্টেশন তৈরি করতে পারেনি। হ্যাঁ, জাসদের একটি সংগঠিত কাঠামো আছে। সে কারণেই দেখবেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অতীতে জাসদ করা অনেক মানুষ শক্তিশালী অবস্থানে এসেছে।
রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির একটি সংমিশ্রণ থাকে। ধরুন, আওয়ামী লীগের এখন যাদের বয়স ৬০ বা তার বেশি, তারা মোটামুটি ১৬-১৭ বছর ক্ষমতার সময়টা উপভোগ করেছেন। তাদের অনেকের জন্য হয়তো এখন রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ খুব একটা নেই।
কিন্তু যারা ৩০ থেকে ৪৫ কিংবা ৫০-এর মধ্যে, তারা খুব ভালোভাবেই জানেন—২১ বছর পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছিল। অতএব, তারা এটাও বিশ্বাস করতে পারেন যে ১৫ বছর পর আবার ক্ষমতায় আসা অসম্ভব নয়।
এই প্রত্যাশাটাই রাজনৈতিক সংগঠনকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম বড় শক্তি।
আর তথা কথিত সুশীল বা ‘ডিপ স্টেটের’ ক্রীড়নকদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ দীর্ঘ প্রচারনার পরেও বিএনপি নেতা তারেক রহমান আজকে প্রধানমন্ত্রী।
যারা মনে করে দাত কামড়ে বসে থাকলে একটা সময় তার সাফল্য আসবে, সে তো প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে শেখ হাসিনার প্রতি তার আনুগত্য ধরে রাখবে।
২. প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা
অন্তত আমি মনে করি, ড. ইউনূস, পিনাকী, জামায়াত ও তাদের প্রক্সিরা একটি কাজ করেছেন—তারা হয়তো চেয়েছেন সেক্যুলার বনাম থিওক্রাসির সংকটটাকে আরও প্রকট করতে, যাতে বাংলাদেশে থিওক্রাসি জয়ী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
কারণ ধর্ম আমাদের গভীর আবেগের জায়গা। প্রচণ্ড পাপী মানুষও হজ করে আসে জান্নাতে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। কিন্তু তারা হয়তো বুঝতে পারেননি, উপমহাদেশে মওদুদীবাদ থেকে দেওবন্দ বহু গুণে শক্তিশালী।
যাই হোক, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির কারণেই মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়। এই আকাঙ্ক্ষার মাত্রা কম-বেশি দেখেই আমরা কাউকে লোভী বা কাউকে ত্যাগী বলি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যক্তিপর্যায়ের ঝুঁকি এত বেশি যে সামষ্টিক কল্যাণের চেয়ে পরিবারকেন্দ্রিক প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি হয়ে ওঠে। তাই কোনো পরিবারের একজন যখন রাজনৈতিক সুবিধা পায়, আর ঢাকায় থাকা elite বা urban educated middle class যখন ছ্যা-ছ্যা করে, তখন আমি সেটাকে খুব একটা পাত্তা দিই না। কারণ নিজের পেটের বাইরে এদের স্যাক্রিফাইস খুব কম।
ধরুন, নির্বাচনের সময় আল জাজিরায় ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত’ ছাত্রলীগের কর্মী রনির সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল। তিনি জানান, তাকে না পেয়ে তার অরাজনৈতিক ছোট ভাইকে ইউনূস সরকার মাসের পর মাস আটকে রেখেছিল।
তিনি নিজেও পালিয়ে পালিয়ে ছিলেন।
এর চেয়ে শতগুণ বেশি বিপর্যস্ত হয়েছে বিএনপি—এমনকি অনেক ক্ষেত্রে জামায়াতের নেতা-কর্মীরাও। ফলে রাজনৈতিক প্রত্যাশার পাশাপাশি প্রতিশোধ গ্রহণের আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হয়েছে।
৩. এলিট রাজনীতি বনাম রাজনৈতিক বাস্তবতা
ঢাকার elite, aristocrat, neo-elite কিংবা urban educated middle class-এর সেই স্যাক্রিফাইস নেই। ফলে তারা বিষয়টিকে শুধু কথিত ন্যায্যতার মোড়কে দেখে।
তারা চায়, ড. ইউনূসের মতো কোনো elite opportunist ক্ষমতায় থাকুক—যাতে বিরাজনীতিকরণের পাশাপাশি রাজনৈতিক পক্ষগুলোর বাইরে নতুন একটি সুবিধাভোগী বলয় তৈরি হয়।
এ কারণেই দেখবেন, দেশে-বিদেশে থাকা neo-elite বা urban educated middle class-এর অনেকেই ‘স্যার পাঁচ বছর’, ‘স্যার পঁচা বছর’—এ ধরনের স্লোগান দিয়ে একটি অগণতান্ত্রিক কাঠামো দাঁড় করানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল।
কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত টিকে যায়।
আর রাজনৈতিক ব্যবস্থা টিকে থাকার সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রত্যাশাও তৈরি হয়—যেমনটি এখন আওয়ামী লীগের কর্মীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে।
একইভাবে, প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার সুর বিএনপির ভেতরেও এখন শোনা যাচ্ছে।
৪. শেখ হাসিনাকে ঘৃণার বস্তু বানাতে পারেনি
হাসিনাকে ঘৃণার বস্তু বানাতে পারেনি।
বরং অপরিপক্বভাবে ডাস্টবিন কান্ড করে তাকে হাল্কা করে ফেলেছে। সেই সাথে বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে যে বাড়ির ইতিহাস জড়িত সেই সিম্বলকে ধবংস করতে গিয়ে ২৪ কে ৭১ এর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
তাই দেখবেন ধানমন্ডি ৩ এর রাজনৈতিক কার্যালয়, সুধাসদন, এমনকি গণভবন ভেঙে আওয়ামী লীগ যতটা কাবু করা গেছে ৩২ ভেঙে ততটাই চাঙ্গা করা গেছে।
শেষ কথা
সমস্যাটা এখানেই। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যদি বর্তমানের এই তিক্ততা কমানো না যায়, তাহলে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবের পাশাপাশি শেখ হাসিনা যে রাজনৈতিক টক্সিসিটি রেখে গেছেন, সেটিও আরও বৃদ্ধি পাবে।
আর তখন প্রশ্নটা শুধু কে ক্ষমতায় যাবে—সেটা থাকবে না।
প্রশ্ন হবে, আমরা কি এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারব, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন প্রতিশোধের চক্র তৈরি করবে না, বরং নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশা ও গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরি করবে?

